মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ সিনেমার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ
- মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’র ব্যাপক সাফল্যের পর তিনি দীর্ঘ নীরবতার পর ‘রইদ’ নির্মাণ করে ফিরে এসেছেন।
- ‘রইদ’ তপ্ত মাটির ওপর বেঁচে থাকার প্রাগৈতিহাসিক লড়াইকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে; এটি সমাজের মোহযুক্ত বিশ্বাস ও মেকি প্রথা ভাঙার দৃশ্যমান শিল্প হিসেবে পরিচিত।
- সিনেমায় ‘অ্যাডাম’ ও ‘ইভ’-এর আদি পাপ, লিবিডো কামনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম তালের রূপকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা গন্ধমের স্থলাভিষিক্ত বলে ভাবা যায়।
- নামহীন নারী চরিত্রটি প্রথার শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক; পাগলির পেটের সন্তান নিয়ে নায়ক চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে এবং সন্তানটিকে হত্যা করতে চায়।
- নায়ক হিসেবে রাখাল সাধু প্রথাগত সমাজের ভয়ভীতি ও দাসত্বের রূপক; ভীতিপ্রদ সমাজ তাকে দিনের পর দিন বন্দী করে রাখে।
- সিনেমায় স্পষ্ট কোনো খলনায়কের উপস্থিতি নেই; প্রকৃতিকে সব সময় জয় করা যায় না এবং মানুষ নিজেই নিজের বন্ধু কিংবা শত্রু হয়ে ওঠে।
- পাগলি নামের নারী চরিত্র (নাজিফা তুষি) সাধুকে বিয়ে করে নিয়ে আসে; সাধু তার নাম জানে না এবং কেবল অন্যের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেই নামের প্রয়োজন হয়।
- সাধু বিয়ে করে গরুর গাড়িতে ঘরে ফেরেন; বাচ্চা ছেলেরা পিছু নেয়, পাগলি নতুন বউকে খেপায় এবং বউটি বকাবকি করে।
- পাগলির আচরণে মনোবিকারজনিত উগ্রতা, অবাধ্য বন্যতা এবং সামাজিক নিয়মের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশ পায়; তিনি বাচ্চাদের গালাগাল করেন, গায়ে থুতু মারেন এবং জনসমক্ষে নাচেন।
- সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘সময়হীনতা’—কোনো আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, ঘড়ি বা সমসাময়িক সামাজিক অনুষঙ্গ রাখা হয়নি।
- গ্রামবাংলার সাধারণ সমাজকে নিষ্ঠুর রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; নারীকে মানবিক ও সৃষ্টিকর্তার অনন্য রূপ এবং ব্যবহার্য পণ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।
- একটি গর্ভবতী ছাগল বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়লে সাধু তাকে জবাই করে মাংস খাওয়ার জন্য উদ্যত, যা সমাজে নারীকে ‘পণ্য’ হিসেবে দেখার সমালোচনা।
- মোস্তাফিজুর নূর ইমরান সাধুর চরিত্রে অসহায়, প্রথাতাড়িত অথচ অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত মানুষের ভূমিকায় অভাবনীয় পারফর্ম করেছেন।
- নাজিফা তুষি ‘হাওয়া’-র ‘গুলতি’ চরিত্রের পর ‘রইদ’-এ নিজেকে আমূল বদলে ফেলেছেন; ত্বকে গ্রামের কড়া রোদের তামাটে পোড়া ছাপ, উষ্কখুষ্ক চুল ও কৃত্রিম দাঁতের প্রলেপ দিয়ে চরিত্রকে যাপন করেছেন।
- মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণশৈলী স্বতন্ত্র; দৃশ্য-নির্মাণে কিছু জোর করে চাপিয়ে দেন না এবং পারিপার্শ্বিক আবহ নিজেই একটি চরিত্র হয়ে ওঠে।
- জোয়াহের মুসাব্বিরের ক্যানভাস ও ক্যামেরা সঞ্চালন সিনেমাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে; প্রাকৃতিক আলো, ফ্রেম ও স্কেলের খেলা, সূক্ষ্ম টেক্সচারধর্মী ক্লোজআপ এবং ক্যামেরার ছন্দময় সঞ্চালন অসাধারণ নান্দনিক রূপ পেয়েছে।
- সিনেমায় কৃত্রিম আলোর বদলে সর্বোচ্চ প্রাকৃতিক সূর্যরশ্মি ব্যবহার করা হয়েছে; কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা এবং সিলেটের দুর্গম গ্রামীণ প্রান্তরে রোদের খড়খড়ে তপ্ত ও পোড়া ভাব ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
- ক্যামেরার মুভমেন্ট অত্যন্ত শান্ত, ধীর ও স্থির; দীর্ঘ সিঙ্গেল শটগুলোর কারণে দৃশ্যের আবহ একটানা বজায় থাকে এবং দর্শক সরাসরি উত্তপ্ত গ্রামীণ পরিবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।
- রূপকের অতিরিক্ত ভার অনেক সময় স্বভাবজাত আবেগপ্রবাহকে ব্যাহত করে এবং কিছু দৃশ্য অতিপরিকল্পিত বা থিয়েটারধর্মী মনে হতে পারে; পার্শ্বচরিত্রগুলোর বিকাশ তুলনামূলকভাবে একরৈখিক বলে মনে হয়েছে।
- সিনেমার সমাপ্তি ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’-এর ব্যঞ্জনামুখর; দর্শকের মনে ঝুড়িভরা প্রশ্ন এবং তীব্র কিছু খটকা থাকে এবং আত্মবিশ্লেষণের দুয়ার খোলা হয়।
- অসাধারণ কাস্টিং, নিখুঁত শব্দ পরিকল্পনা ও জোয়াহের মুসাব্বিরের অবিস্মরণীয় সিনেমাটোগ্রাফির সৌজন্যে ‘রইদ’ বাংলা চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক ক্যানভাসে নতুন, সাহসী ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ে উন্নীত করেছে।
তথ্য যাচাই
প্রথম আলোতে ২০২৬-১০-১১ তারিখে এই লেখা প্রকাশিত হয়েছে; মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’ এবং দ্বিতীয় নির্মাণ ‘রইদ’—এই তথ্য প্রথম আলোর আর্টিকেল থেকে যাচাইকৃত। নাজিফা তুষি ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের অভিনয় সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রথম আলোর লেখায় উপস্থিত।
পক্ষপাত বিশ্লেষণ
লেখাটি মূলত একটি ইতিবাচক সমালোচনা; পরিচালক ও প্রধান অভিনেতাদের কাজের প্রশংসা প্রবল, তবে রূপকের অতিরিক্ত ভার এবং পার্শ্বচরিত্রের একরৈখিক বিকাশের মতো সীমাবদ্ধতাও নিরপেক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।