সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন করে জড়িয়ে পড়ল
- ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে চলতি সামরিক অভিযানের নাম ‘ইয়েমেন্স ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ রাখা হয়েছে; গত কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্তি ভেঙে গ্রীষ্মে গৃহযুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে।
- সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইয়েমেন থেকে ইরান–সমর্থিত হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে বিভিন্ন শহরে আঘাত হানার মুখে পড়েছেন, যা তাঁর আঞ্চলিক অশান্তি পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চেয়েছিলেন এমন পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
- সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের অবসান ঘটিয়েছে; গত বছরের শেষের দিকে ইউএইর পাঠানো সামরিক যানের চালানে সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালালে দুই দেশের জোটে ফাটল ধরেছিল।
- ইউএইর সেনা প্রত্যাহারের পর ইয়েমেনে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, সৌদিরা সেই শূন্যতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং হুতিবিরোধী স্থানীয় অংশীদারদের সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
- সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র এর ওপর ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে; গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই ও ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ হতাশ হয়েছে।
- যুবরাজ বিন সালমান গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলে হুতিদের ওপর সরাসরি হামলার অনুরোধ জানিয়েছেন, কিন্তু ট্রাম্প তাতে রাজি হননি এবং ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে তাদের নিজস্ব যুদ্ধবিরতি রক্ষায় মনোযোগ দিচ্ছে।
- রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হয়েছে; সৌদি পাইলসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন বলে সৌদি দেওয়া তথ্য আছে।
- হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি ও পেরিম দ্বীপ দিকে অগ্রসর হয়েছে, লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে; এ অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ।
- হুতিরা সৌদি তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে হামলা চালিয়ে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত করেছে এবং তেলের দাম বেড়েছে; সৌদি বাহিনী তাদের লক্ষ্যে শত শত বিমান হামলা চালিয়ে জবাব দিয়েছে।
- ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদ কে ফোন করে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে কথা বলেছেন এবং ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সংলাপে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
- ইরান ও সৌদির কূটনৈতিক সম্পর্ক ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত চুক্তির অধীনে পুনর্বহাল করা দূতাবাসগুলো চালু থাকলেও, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের পর তেহরান ও রিয়াদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।
- সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তান এর সঙ্গে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র অধীনে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সম্মত হয়েছে এবং ফ্রান্স সামরিক কর্মীসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েনে রাজি হয়েছে।
- রিয়াদে এক জরুরি বৈঠকের পর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুযায়ী সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সম্মত হয়েছে।
- বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বাইরের দেশের সমর্থন এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের প্রাথমিক সাফল্য চলতি সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করতে পারবে না এবং সৌদি আরব এখন সংযম ও সংঘাত বৃদ্ধি—দুই পথেই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
- সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি সিএনএনকে বলেছেন, রিয়াদ এখন নিজেদের এ সংঘাতের ঠিক মাঝখানে আবিষ্কার করছে এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত ভূমিকায় সৌদি আরব সম্ভবত নিজেদের অরক্ষিত বোধ করছে।
- সৌদি আরবের তেল রপ্তানি কমে যাচ্ছে, বড় বড় প্রকল্প বাতিল হচ্ছে এবং দেশটি একটি যুদ্ধের দিকে টানাহেঁচড়ার শিকার হচ্ছে, ফলে যুবরাজের পরিকল্পনাগুলো এখন আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
- আঞ্চলিক এই অস্থিরতার কারণে সৌদি আরবে তারকাবহুল চলচ্চিত্র উৎসব, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও কনসার্ট স্থগিত করতে হয়েছে এবং চলতি অক্টোবরের শেষে মরুভূমির দাভোস আর্থিক সম্মেলন চরম চাপের মুখে পড়েছে।
- নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, আমিরাতের সেনা যখন চলে যায় তখন দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে হয়নি এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।
- ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি দাবি করেছেন, হুতিদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আগের তুলনায় দ্রুতগতিতে উড়ে যায় এবং তাপ শনাক্তকারী ব্যবস্থা ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হয়।
- ইয়েমেনের সরকার অভিযোগ করেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে হুতিরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন এনেছে।
- বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যেতে হলে সুশৃঙ্খল সংগঠন, আঞ্চলিক সমর্থন, তহবিল ও লজিস্টিকস সহায়তার প্রয়োজন, যা বর্তমান সৌদি জোট ধরে রাখতে পারবে কি না এখনো নিশ্চিত নয়।
তথ্য যাচাই
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেছেন—সিএনএন ও মানবজমিন উভয়ই এটি নিশ্চিত করেছে। কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলায় ১৪ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত—আল–জাজিরা এই সংখ্যা দিয়েছে। হুতিদের বাব আল-মানদেব প্রণালি ও পেরিম দ্বীপ দিকে অগ্রযাত্রা—রয়টার্সের প্রতিবেদনের উল্লেখ আছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি—সিএনএন প্রতিবেদনে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্মতি উল্লেখ আছে।
পক্ষপাত বিশ্লেষণ
সিএনএন-ভিত্তিক প্রথম আলো ও মানবজমিন প্রতিবেদনে সৌদি আরবের ভুল হিসাব ও ব্যর্থতা তুলে ধরার প্রবণতা বেশি; মানবজমিন হুতিদের কৌশলগত সক্ষমতা ও সৌদির দুর্বলতা তুলে ধরেছে। আল–জাজিরা ইরানের ভূমিকা ও কূটনৈতিক প্রস্তাবকে বেশি তুলে ধরেছে এবং সৌদি আরবের অবস্থানকে মাঝে মাঝে প্রতিরক্ষামূলকভাবে উপস্থাপন করেছে।