গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব: সংবিধানের নীতি ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ
- বাংলাদেশের সংবিধান গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লবকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার অন্তর্ভুক্তি নগর-গ্রামের জীবনযাত্রার বৈষম্য দূর করা এবং গ্রামে বৈদ্যুতিকীকরণ, কুটিরশিল্প ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলে।
- বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ গ্রামে ও ৩০ শতাংশ শহরে বসবাস করে; ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প-কারখানা ছিল না এবং গ্রামে বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবস্থা ছিল না।
- পাকিস্তান শাসনামলের ২৩ বছরে সব শহরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা হলেও গ্রামীণ জনপদের প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে ছিল এবং গ্রাম থেকে শহরে আসার রাস্তাও যথাযথ ছিল না।
- বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর গ্রামের পথঘাট উন্নত হয়েছে, প্রায় সব গ্রামে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা পাওয়া যায় এবং সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, টিভি, ফ্রিজ ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
- গ্রামাঞ্চলে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তিন দশকের বেশি আগে শুরু হলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি; ছয় থেকে আট সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের গৃহস্থালি বর্জ্য দিয়ে ন্যূনতম জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও মানুষের আগ্রহ কম।
- উন্নত দেশগুলোতে গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর অবশিষ্ট কৃষিজমিতে জৈবসার হিসেবে ব্যবহৃত হয়; আমাদের দেশেও এটা সম্ভব এবং জৈবসারে ফসলের মূল্য রাসায়নিক সারের তুলনায় দুই-তিন গুণ বেশি হতে পারে।
- বাংলাদেশে ইউরিয়া সার উৎপন্ন হলেও বার্ষিক চাহিদা মেটে না, টিএসপি সারের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনা হয় এবং পটাশ সারের কারখানা এখনো গড়ে উঠেনি।
- কৃষকরা একই ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হলে ফসলের বাড়তি উৎপাদনের কারণে মূল্য পড়ে গিয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এলাচি, দারুচিনি, গোলমরিচ, জিরা, জাফরান, জয়ত্রি প্রভৃতি মসলাজাতীয় ফসল আমাদের দেশে কম বা একেবারেই উৎপন্ন হয় না।
- বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উচ্চ ফলনশীল বীজ ও সারের আনুপাতিক ব্যবহারের কারণে ফসলের উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে এবং একই ভূমিতে দুই-তিন ফসল বা ধান-মাছ একসাথে চাষ সম্ভব হয়েছে।
- কৃষিপণ্যের পাইকারি বিক্রয়মূল্য ও খুচরা বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক থাকায় বাড়তি উৎপাদন কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারছে না এবং কিছু কৃষিপণ্য রফতানি হয়।
- সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি সরকার বার্ষিক রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটে যথাযথ বরাদ্দ প্রদানে সচেষ্ট থাকলেও বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ জনপ্রতিনিধি ও সরকারি ব্যক্তিদের দ্বারা লুণ্ঠিত হওয়ায় কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন হচ্ছে না।
- গ্রামে কৃষির পাশাপাশি কুটিরশিল্পের বিকাশ করলে গ্রামের মানুষ শহরমুখী হতে পারে তবে এযাবৎকাল পর্যন্ত এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়।
তথ্য যাচাই
সংবিধানে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লবের নীতি থাকার কথা স্পষ্ট; জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ গ্রামে বসবাস করে; পাকিস্তান শাসনামল ২৩ বছর ছিল; জৈবসারে ফসলের মূল্য রাসায়নিক সারের দুই-তিন গুণ বেশি হতে পারে—এই তথ্যগুলো প্রবন্ধে উল্লিখিত। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের সংখ্যা বা বরাদ্দকৃত অর্থের নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রবন্ধে উল্লেখ নয়, তাই সেই বিষয়ে যাচাই করা যায়নি।
পক্ষপাত বিশ্লেষণ
প্রবন্ধটি একটি মতামতভিত্তিক বিশ্লেষণ (op-ed) হিসেবে লেখা; সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও সরকারি ব্যক্তিদের দ্বারা অর্থ লুণ্ঠনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে যা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়।